লোড করা হচ্ছে ...

খুতবার বিষয়: হজ্জের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কল্যাণ

হজ্জের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কল্যাণ



আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। নাহমাদুহু ওয়ানুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহ এবং আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুল্লাহ ওয়া রাসূলুহ। ইয়া আইুহাল্লাজিনা আমানুততাুল্লাহা হাক্কা তুকাতিহি ওয়ালা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুন। ইয়া আইুহাল্লাজিনা আমানুততাুল্লাহা ওয়া কুলু কওলান সাদিদা। আম্মাবাদ, খাইরাল হাদিস কিতাবুল্লাহ ওয়া খাইরাল হাদি মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আইুহাল মুসলিমুন, ইত্তাকুল্লাহ আজওজাল। সুবহানাকা লা ইলমা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা ইন্নাকা আলতাল আলিমুল হাকিম। আলহামদুলিল্লাহ, হজের মাস সমূহ আমাদের কাছে সমাগত হয়েছে। এই মাসগুলোর মধ্যে দুটো মাসই হচ্ছে হারাম মাসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত— জিলকদ এবং জিলহজ। এরপর আরেকটি হারাম মাস হলো মহররম এবং পরবর্তীতে রজব মাস। হজের মাসগুলোর মধ্যে আমরা দুটো হারাম মাস পাচ্ছি— জিলকদ এবং জিলহজ। হজের অসংখ্য ফজিলত রয়েছে যা নিয়ে গত খুতবায় কিছু আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আল কোরআনের সূরা আল বাকারা ও সূরা আল ইমরানে হজ নিয়ে অনেক বক্তব্য দিয়েছেন এবং একটি সূরার নামই রেখেছেন সূরাতুল হাজ। গতকালকে এশার পর আমি সূরাতুল হজের হজ সম্পর্কিত আয়াতগুলো নিয়ে উত্তরায় একটা আলোচনা করেছিলাম।

আজকে আমরা এখানে যে আলোচনাগুলো করব সেটি হচ্ছে হজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যেটাকে মাকাসিদুল হজ বলা হয়। এবং পাশাপাশি হজের কল্যাণগুলো নিয়ে আলোচনা করব যেটি হলো ফাওয়ায়েদুল হজ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সূরা আল ইমরানে হজ ফরজ হওয়ার ব্যাপারে একটি আয়াত উল্লেখ করেছেন। আর মানুষের উপর যারা হজ করার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর হজ করা আল্লাহর জন্য ফরজ। এখানে আল্লাহ সুবহানাতালা উল্লেখ করে দিয়েছেন তুমি মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিয়ে দাও, তারা আসবে পায়ে হেঁটে অথবা ক্ষীণকায় উটের পিঠে চড়ে যারা দূর-দূরান্ত হতে তাদেরকে নিয়ে আসবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে যেন তারা তাদের জন্য যে কল্যাণ হজের মধ্যে রয়েছে তা প্রত্যক্ষ করে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। আল্লাহর নাম স্মরণ করার অর্থ এখানে অনেকগুলো মুফাসসিরনে কেরাম বলেছেন যে, সেটি হচ্ছে হজের দিনগুলোতে অনেকগুলো কাজ। এই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সেই কাজগুলো করার মধ্য দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে। আবার তাকবীরের মধ্য দিয়েও আল্লাহর নাম স্মরণ করবে: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওলিল্লাহিল হামদ।

তাহলে আমাদের কাছে এটা একদমই স্পষ্ট যে হজ ফরজ, তবে সবার উপর নয়— যারা সামর্থ্য রাখে। জীবনে কয়বার? একবার। নবী সাল্লাল্লাহু সাল্লামকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ হজ কি তাহলে প্রতিবছরই হবে? তিনি বললেন আমি যদি হাঁ বলতাম তাহলে হাঁ হয়ে যেত। কিন্তু একবারই, তোমরা বেশি প্রশ্ন করো না। তাহলে হজ জীবনে একবার ফরজ। আমাদের দেশে অনেকেই হজ ফরজ হওয়ার পরেও নানা অজুহাতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে। আবার অনেকেই হজের টাকা জোগাড় থাকলেও অন্যখানে ইনভেস্ট করে ফেলে এবং পরে বলে যে এখন আর টাকা নেই। কারো মেয়ের বিয়ে দেওয়ার বিষয় থাকে, তারা হজ বিলম্ব করেন যে মেয়ের বিয়ের পরে হজে যাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন হজের ব্যাপারে শরয়ী বিধান হচ্ছে এটা বিলম্ব না করে যেই বছর ফরজ হয় সেই বছরই আদায় করা। যদি সম্ভব হয়, অর্থাৎ আপনার পক্ষে নিয়ম অনুযায়ী যেই বছর হজ পালন করা সম্ভব, সেটিই আপনার জন্য প্রথম বছর এবং সেখানেই আপনাকে সেই বছরই হজ আদায় করতে হবে। অন্যথায় এই কালক্ষেপণের কারণে আল্লাহ সুবহানাতালা কবিরা গুনাহ দেবেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেছিলেন সবচেয়ে উত্তম কাজ কোনটি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন আল্লাহ এবং রাসূলের প্রতি ঈমান রাখা। এরপর আল্লাহর পথে জিহাদ করা এবং তারপর হজ্জে মাবরুর। হজ্জে মাবরুর হলো সেই হজ যা আল্লাহ কবুল করেন এবং যাতে কোনো পাপ বা অশ্লীল কাজ থাকে না। ওলামায়ে কেরাম বলেছেন এর প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো এটি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। এরপর হজের রোকনগুলো— ফরজ এবং ওয়াজিবাতগুলো সুন্দরভাবে আদায় করতে হবে। অনেকেই আমাদের দেশে মিনায় থাকার মতো ওয়াজিব ছেড়ে দিয়ে হোটেলে থাকে, যা হজ্জে মাবরুর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের রেফারেন্স সবসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এছাড়া হজের মধ্যে হাজী সাহেব সবসময় ভালো কাজে লিপ্ত থাকবেন, মানুষকে খাওয়াবেন এবং ঝগড়াঝাঁটি বা অশ্লীলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবেন। হজ্জে মাবরুরের প্রতিদান হলো জান্নাত। নবী (স) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ করল এবং কোনো পাপ বা অশ্লীল কাজ করল না, সে সেই নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসলো। তাই যারা হজ করতে যাচ্ছেন তারা চূড়ান্ত গুরুত্ব দিবেন। আমাদের দেশে অনেকে প্রথম হজের গুরুত্ব কমিয়ে নফল হজের প্রস্তুতি নেন, যা একটি বিপর্যয়; বরং প্রথম হজটিকেই সবচেয়ে সফল করা উচিত।

হজের লক্ষ্য বা মাকাসেদ বোঝা খুবই জরুরি, কারণ লক্ষ্য মিস হয়ে গেলে কাজের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। হজের প্রথম লক্ষ্য হলো তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা। হজের শুরুতেই তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে তাওহীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তালবিয়া হলো: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকালাক। এছাড়া তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া এবং আরাফাতের ময়দানে জিকিরের মাধ্যমে কেবল তাওহীদকেই তুলে ধরা হয়। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা। হজে মনগড়া কিছু করার সুযোগ নেই। তৃতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা। বাজারের চটি বই বা ভুল গাইডেন্সের বদলে সহীহ হাদিসের আলোকে হজ করতে হবে। চতুর্থত, আখেরাতকে স্মরণ করা— মিনায় বা আরাফায় সাদা কাপড় পরিহিত মানুষের উপস্থিতি হাশরের ময়দানের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়। পঞ্চমত, মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং দ্বীনি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা। ষষ্ঠ লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহকে তাওহীদ ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা। এছাড়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর (কাবা, সাফা, মারওয়া, মাকামে ইব্রাহিম) প্রতি শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ জাগ্রত করাও হজের বড় লক্ষ্য।

হজের কল্যাণের মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহর সাথে গভীর সংযোগ স্থাপন করা। হজের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করে একনিষ্ঠ ইবাদতকারী বান্দা হওয়ার সুযোগ পায়। এই দিনগুলোতে আল্লাহকে সহীহ পদ্ধতিতে বেশি বেশি স্মরণ করতে হবে। সুন্নাহ পদ্ধতিতে জিকির ও ইবাদত না করলে তা কবুল হবে না। এছাড়া হজের মাধ্যমে ধৈর্য ও ইতিবাচক আচরণের মতো সফট স্কিল অর্জিত হয়। হজের সময় পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের দ্বার উন্মোচিত হয়। হজের আমলের ক্ষতি না করে এই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করাও কোরআনের দৃষ্টিতে জায়েজ। সবশেষে, আল্লাহর দেওয়া সুস্বাস্থ্য ও সময়ের মতো নেয়ামতগুলোর শোকর আদায় করতে হবে এবং সেগুলোকে সঠিক কাজে ব্যয় করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তৌফিক দান করুন। আমীন।